২০ বছর আগে ইতালীতে করুণ মৃত্যু অভিমানী শামসুদ্দীন আবুল কালামের

by Lesar on জানুয়ারী ১০, ২০১৭পোস্ট টি ১,৭২৯ বার পড়া হয়েছে in ইতালির অন্যান্য নগরীর নিউজ

মাঈনুল ইসলাম নাসিম : প্রচন্ড অভিমানী কবি-সাহিত্যিকরা শুধু ইদানিংকালেই নয়, ২০ বছর আগেও বরণ করে নিয়েছিলেন অস্বাভাবিক মৃত্যু। কাউকে কিছু না বলে স্বেচ্ছায় ‘না ফেরার দেশে’ চলে যাওয়া তেমনি একজন বাংলার প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক শামসুদ্দীন আবুল কালাম। ১৯৯৭ সালের ১০ জানুয়ারি ইতালীর রাজধানী রোমে নির্জন এক এপার্টমেন্টে জীবনাবসান ঘটে আত্ম-অভিমানী এই মেধাবী বাঙালির। ১৯৫৯ সাল থেকে স্থায়ীভাবে বসবাস করছিলেন তিনি ইতালীতে। দেশটির ‘প্রথম বাংলাদেশী’ শামসুদ্দীন আবুল কালামের জন্ম ১৯২৬ সালে বাংলাদেশের বরিশালে। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ইতালী থেকে ব্যাপক জনমত সৃষ্টি করে তিনি অসামান্য অবদান রেখেছিলেন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে। ১৯৫৯ থেকে ১৯৯৭ ইতালীতে সুদীর্ঘ ৩৮ বছরের প্রবাস জীবনের শেষ দিনগুলোতে নিঃসঙ্গতা গ্রাস করলেও দেশটির কর্মক্ষেত্রে ছিল তাঁর সফল পদচারণা।

সত্তরের দশকে শামসুদ্দীন আবুল কালাম কর্মরত ছিলেন জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থ (ফাও)-এর রোমস্থ সদর দফতরে এবং ইতালিস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসে। ইতালীয়ান ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতেও ছিল তাঁর পদচারণা। ইতালীতে আসার আগেই পঞ্চাশের দশকে প্রকাশিত হয় শামসুদ্দীন আবুল কালামের বেশ ক’টি বিখ্যাত উপন্যাস। বিখ্যাত এই কথাসাহিত্যিকের সবচাইতে সাড়াজাগানো উপন্যাস ‘কাশবনের কন্যা’ প্রকাশিত হয় ১৯৫৪ সালে। পরবর্তীতে পাঠকদের তৃষ্ণা মেটাতে আসে উপন্যাস – দুই মহল (১৯৫৫), কাঞ্চনমালা (১৯৫৬), জীবন কান্ড (১৯৫৬), জাইজঙ্গল (১৯৭৮), মনের মতো স্থান (১৯৮৫), সমুদ্রবাসর (১৯৮৬), যার সাথে যার (১৯৮৬), নবান্ন (১৯৮৭) ও কাঞ্চনগ্রাম (১৯৮৭)। ভাষা আন্দোলনের বছর ১৯৫২ সালে প্রকাশিত হয় শামসুদ্দীন আবুল কালামের গল্প সংগ্রহ ‘অনেক দিনের আশা’। পরের বছর ‘ঢেউ’ ও ‘পথ জানা নেই’। দুই হৃদয়ের তীর (১৯৫৫) এবং সাহের বানু (১৯৫৭) এই বাঙ্গালী গুণীজনেরই অমর সৃষ্টি।

১৯৫৯ সালে ইতালী পাড়ি জমাবার আগে সংসার জীবনে অবশ্য সুখী হতে পারেননি শামসুদ্দীন আবুল কালাম। কন্যা ক্যামেলিয়ার জন্মের পর স্ত্রীর সাথে ডিভোর্স হয়ে গেলে পরে ঐ ভদ্রমহিলাকে বিয়ে করেন প্রখ্যাত অভিনেতা গোলাম মোস্তফা। নতুন সংসারে জন্ম হয় সুবর্ণার, যিনি পরবর্তিতে বাবার যোগ্য উত্তরসূরী হিসেবে সুবর্ণা মোস্তফা নামে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। সৎবোন ক্যামেলিয়া মোস্তফা কিছুদিন অভিনয় জগতে থাকলেও এক পর্যায়ে পাড়ি জমান বিদেশ বিভুঁইয়ে, বাবার পথ ধরে। তবে ইতালীতে আসেননি ক্যামেলিয়া, নিউইয়র্কের একটি রেস্টুরেন্টে কাজ নেন জীবিকার তাগিদে। ১৯৯৭ সালে শামসুদ্দীন আবুল কালামের মৃত্যুর সময় নিউইয়র্কেই অবস্থান করছিলেন ক্যামেলিয়া মোস্তফা। বৈধ স্টে পারমিট না থাকার কারণে আমেরিকা থেকে বের হতে পারেননি তখন তিনি। অবশ্য মৃত্যুর পরপরই বাবার একাউন্টে থাকা প্রায় ১২ হাজার ডলারের সমপরিমাণ ইতালীয়ান লিরা আমেরিকাতে বসেই দ্রুত বুঝে নেন ক্যামেলিয়া। বেশ কয়েক বছর পর ক্যামেলিয়া বাংলাদেশ ফিরে গেলেও ইতালীতে বাবার সমাধি এক নজর দেখতে আসার প্রয়োজন মনে করেননি। তার উদাসীনতার কারণেই মূলতঃ শামসুদ্দীন আবুল কালামের সমাধি বিগত ২০ বছরে রোমের খ্রিস্টান গোরস্থান থেকে পাশের মুসলিম গোরস্থানে স্থানান্তরিত হয়নি।

সত্তর ও আশির দশকে ইতালীতে ছিল খুব স্বল্প সংখ্যক বাংলাদেশীর বসবাস। নব্বইর দশকে দেশটিতে বাংলাদেশীদের আগমন দ্রুত বৃদ্ধি পেলেও স্বদেশীদের সাথে খুব একটা মেশা হয়ে ওঠেনি তাঁর। বাংলাদেশ দূতাবাসে চাকরীর অভিজ্ঞতা সম্পন্ন আরেক প্রবীন বাংলাদেশী লুৎফর রহমান যিনি এখনও জীবিত আছেন, মূলতঃ তাঁর সাথেই কদাচিৎ দেখা-সাক্ষাৎ হতো শামসুদ্দীন আবুল কালামের। তবে দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আত্ম-অভিমানী এই কথাসাহিত্যিক জীবনের শেষ দিনগুলোতে এতোটাই জীবনবিমূখ হয়ে উঠেছিলেন যে, ব্যাংকে পর্যাপ্ত অর্থ থাকা সত্বেও বাজার করতেন না এমনকি প্রায়শই খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে দিয়ে এবং জীবনরক্ষাকারী ঔষধ সেবন না করে স্বেচ্ছায় ধাবিত হন নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে।

শামসুদ্দীন আবুল কালামের দুঃখজনক মৃত্যুর সময় ১৯৯৭ সালে এই প্রতিবেদক রোমে স্থায়ীভাবে বসবাসের পাশাপাশি ঐ সময়কার ঢাকার একটি বহুল প্রচারিত দৈনিকের ইতালী প্রতিনিধির দায়িত্বে থাকলেও তাৎক্ষণিকভাবে জানতে পারেননি কিছুই। প্রবীণ কমিউনিটি ব্যক্তিত্ব লুৎফর রহমান সহ সবাই জানতে পারেন রোমে তাঁকে সমাহিত করার বেশ কিছুদিন পর ঢাকার অন্য একটি দৈনিকে লন্ডনের বিশেষ সূত্রের বরাত দিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হলে। পরে রোম প্রশাসন কর্তৃক জানানো হয়, শামসুদ্দীন আবুল কালাম তাঁর নির্জন এপার্টমেন্টে মারা যাবার বেশ অনেক ঘন্টা পর ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী দল বহুতল ভবনের বাইরে থেকে জানালা ভেঙ্গে লাশ উদ্ধার করে।

শামসুদ্দীন আবুল কালামের মরদেহ উদ্ধারের পর ডকুমেন্টে বা অন্য কোথাও ধর্মীয় পরিচয় না থাকায় এবং আত্মীয় বা নিকটজন কারো কোন সন্ধান পুলিশ না পেয়ে মূলতঃ ‘বেওয়ারিশ’ লাশ হিসেবে তাঁকে রোমের এক প্রান্তে ‘প্রিমাপর্তা’ এরিয়াতে জানাজা ছাড়াই খ্রিস্টান গোরস্থানে সমাহিত করে। পাশেই মুসলিম গোরস্থান থাকলেও ‘রক্ত-সম্পর্কীয়’ নিকটজনের অনুমতি না পাওয়ায় আজো স্থানান্তর করা হয়ে ওঠেনি বাংলার এই প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিকের সমাধি। প্রবীণ কমিউনিটি ব্যক্তিত্ব লুৎফর রহমান গত ২০ বছর ধরে যখনই সময় পেয়েছেন ছুটে গেছেন ‘প্রিমাপর্তা’ সমাধিক্ষেত্রে, করেছেন পরিচর্চা। নিউ ইয়র্কে এবং ঢাকায় ক্যামেলিয়াকে এ বিষয়ে বহুবার জানানো হলেও জন্মদাতা পিতার সমাধি সঠিক স্থানে স্থানান্তরের সামান্য ‘ক্লিয়ারেন্স’ দেবার তাগিদ অনুভব করেননি কন্যা। অসুস্থতা জণিত কারণে কয়েক বছর আগে ঢাকাতে ক্যামেলিয়াও চলে যান ‘না ফেরার দেশে’।

শামসুদ্দীন আবুল কালামের প্রতি ‘যারপরনাই’ উদাসীন রোমের বিশাল বাংলাদেশ কমিউনিটিও। বাংলাদেশ ভিত্তিক নোংরা রাজনীতি এবং জেলা-থানা ভিত্তিক আঞ্চলিকতার ভিলেজ পলিটিক্স চর্চার নামে ইজমপূজায় ব্যস্ত থাকার পরিণতিতে এখানকার বাংলাদেশ কমিউনিটি আজ অবধি ন্যূনতম সম্মান দেখায়নি ‘প্রিমাপর্তা’ সমাধিক্ষেত্রে চিরনিদ্রায় শায়িত বাংলার এই সোনার সন্তানের প্রতি। যে দূতাবাসে একদা তিনি কর্মরত ছিলেন, রোমের সেই বাংলাদেশ দূতাবাসেরও তেমন কোন মাথাব্যথা নেই শামসুদ্দীন আবুল কালামের স্মৃতির প্রতি সম্মান দেখিয়ে ভালো ও সৃষ্টিশীল কোন উদ্যোগ নেবার। আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে আক্ষেপের সুরে একটাই অনুভূতি, “প্রবাসী বাঙালি/বাংলাদেশীরে হে মুগ্ধ জননী রেখেছ বাঙালি/বাংলাদেশী করে মানুষ করোনি”।

InstaForex *****লেখাটি ভালো লাগলে আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুণ!*****

সম্পর্কিত আরো কিছু পোস্ট দেখতে পারেন...

ইতালিতে একটা ঘটনা খুব আলোড়িত করেছে এবং সবার আলোচনার বিষয় হয়ে দারিয়েছে
বিজ্ঞাপন একটি SAMSUNG GALAXY S2 সেট বিক্রি করতে চাই।
ইতালির শহর বোলজানোতে প্রবাসীদের পিঠা ও বসন্তের উৎসব পালন।
ফ্রী বিজ্ঞাপন- রোমে একটি রুম ভাড়া চাই এবং স্পেন থেকে কাজের জন্য বিনীত অনুরোধ
ইতালির বোলজানোতে তিন দেশের প্রদর্শনী মেলা।
ইতালির বোলজানোতে শেষ হল ৫ দিনের “Art Exhibition” চিত্র প্রদর্শনী।

এই লেখাটি লিখেছেন...

– সে এই পর্যন্ত 1176 টি পোস্ট লিখেছেন এই সাইট এর জন্য আমিওপারি ডট কম.

আমিওপারি নিয়ে আপনাদের সেবায় নিয়োজিত একজন সাধারণ মানুষ। যদি কোন বিশেষ প্রয়োজন হয় তাহলে আমাকে ফেসবুকে পাবেন এই লিঙ্কে https://www.facebook.com/lesar.hm

লেখকের সাথে যোগাযোগ করুন !

আপনার মন্তব্য লিখুন

{ 0 comments… add one now }

Leave a Comment